রবীন্দ কাছারি বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে মাথা
উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শাহজাদপুরের সঙ্গে রবীন্দনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
তার মানস গঠনেও এ অঞ্চলের প্রভাব অনস্বীকার্য। ১৯৪০ সালে ‘বাণী সম্মেলনীতে তিনি স্বহস্তে লিখে পাঠান সে
কথা। তিনি বলেছেন, শাহজাদপুর তার অন্তরে নিবিড়ভাবে
জড়িয়ে আছে, সে সাহিত্য সাধনার যোগ, স্নেহ সেবার যোগ। ১৯৩৯ তের
টাকা দশ আনায় জমিদারি কিনে নেন। তার আগে এখানে ছিল নীলকরদের নীলকুঠি। অভ্যাসবসত এর
নাম কুঠিবাড়িই রয়ে গেছে। হলুদ রঙের দোতলা ভবন। ভবনের দৈর্ঘ্য ২৬.৮৫ মিটার, প্রস্থ ১০.২০ মিটার, উচ্চতা ৮.৭৪ মিটার। প্রতি
তলায় সাতটি করে ঘর। উত্তর ও দক্ষিণে প্রশস্থ বারান্দা। কুঠি-ভবনের পাশেই কাছারি
বাড়ি, মালখানা ও কর্মচারীদের
বাসগৃহ। পুরোটাই ‘রবীন্দ -কাছারি। বর্তমানে
একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম করা হয়েছে। অডিটোরিয়ামে স্থানীয় অনুষ্ঠান এবং জাতীয়
পর্যায়ে রবীন্দ -জš§জয়ন্তির অনুষ্ঠান করা হয়।
প্রায় দশ বিঘা জমির ওপর পুরো কাছারি বাড়ির অবস্থিতি। ১৮৯০ সালে লন্ডন থেকে ঘুরে
আসার পর রবীন্দ নাথ ঠাকুরের ওপর জমিদারি তদারকির ভার ন্যস্ত হয়। সে সময় কোনও
স্থলযান চলাচলের রাস্তা ছিল না। বোটে করে পদ্মা এবং সালে শাহজাদপুরের শ্রী হরিদাস
বসাকের চিঠির জবাবে লিখেছিলেন, সেই আমার দূরবর্তী শাহজাদপুর অনেকবার আমার মনকে টানে....। আবার, শাহজাদপুরেই যেন ধরণীর সঙ্গে
কবিগুরুর প্রণয় ঘটে। ২৩ জুন ১৮৯১ সালে ইন্দাণী দেবীকে লিখেছেন, তীরে যেখানে নৌকো বাঁধা আছে
সেইখান থেকে একরকম ঘাসের গন্ধ এবং থেকে থেকে পৃথিবীর একটা গরম ভাপ গায়ের উপরে এসে
লাগতে থাকে মনে হয় এই জীবন্ত উত্তপ্ত ধরণী আমার খুব নিকটে থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে, বোধ করি আমারও নিঃশ্বাস তার
গায়ে গিয়ে লাগছে। (২৩নং পত্র, ছিন্নপত্রাবলী)।
১৮৯০ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত
রবীন্দ নাথ শাহজাদপুরে জমিদারি দেখাশোনা করেছেন। ১৮৪০ সালে রবীন্দ নাথের পিতামহ
প্রিন্স দ্বারাকানাথ ঠাকুর রানী ভবানীর কাছ থেকে আরও কয়েকটি নদী দিয়ে ভাসতে ভাসতে
শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ির ঘাটে এসে নামতেন তিনি। নদীতে পানি কম থাকলে সোনাই নদীতে বোট
রেখে রাউতারা থেকে পালকি করে আসতেন। ফুলঝোর নদী থেকে শাখা বেরিয়ে কুঠিবাড়ির পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম তিনদিক বেষ্টন করে
তিন মাইল দক্ষিণের হুড়া সাগরে মিশেছিল। এই শাখা নদীতেই বোট এসে কুঠিবাড়িতে ভিড়ত।
এখন সেখানে পাকা রাস্তা। নদীর চিহ্নমাত্র নেই। আবার, কুটিবাড়িতে আসার জন্য নদী
পথও নেই। তবে, ঢোকার পথ মোটামুটি একই আছে।
কবিগুরু বোট বা পালকি করে যে পথে আসতেন, সেই পথেই এখন বাস বা রিকশা
চলাচল করে। শাহজাদপুরে দিলরুবা বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকের রাস্তা চলে গেছে
কুঠিবাড়ির দিকে। রাস্তার শেষ মাথায় উত্তর-দক্ষিণ দুদিকে দুটি রাস্তা গেছে। উত্তর
দিকের রাস্তায় গেলেই ‘রবীন্দ -কাছারি বাড়ি। কাছারি
বাড়ির পেছন দিকের গেইট এইটি। বর্তমানে এটাকেই প্রধান গেইট করা হয়েছে। সে সময়
এখানেই ছিল ছোট নদীটি, যার ঘাটে কবির বোট এসে থামত।
কাছারি বাড়ির গেটে দাঁড়ালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় বাগান। নানা রঙের ফুল। রবীন্দ নাথ
এখানে ট্যাংক তৈরি করিয়েছিলেন বারো মাস পদ্ম রাখার জন্য। ট্যাংকটির চারদিকে
সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বাঁধান ছিল। এখন অবশ্য সেই কৃত্রিম হ্রদ-পদ্ম নেই। তবে
বাগানের ফুল দেখে রবীন্দ নাথের প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। বাগানের পরই তার
হলুদ রঙের দোতলা কুঠি। নিচের তলা জুড়ে রবীন্দ নাথের নিজের বিভিন্ন ছবি, তার আঁকা ছবি এবং তার হাতে
লেখা পাণ্ডুলিপির পাতার অংশ বাধাই করে দেয়ালে টানানো রয়েছে। কিছুদিন আগেও এখানে
লাইব্রেরি ছিল। অডিটোরিয়াম হওয়ার পর লাইব্রেরিটি তারই একটি কক্ষে স্থানান্তরিত
হয়েছে। উত্তরদিকের বারান্দার একেবারে পশ্চিমে সিঁড়িঘর। গোল-প্যাঁচানো সিঁড়িটি যেন
সবাইকেই উপরে উঠতে আহ্বান করে। ওঠার সময় পশ্চিমে একটি জানালা। সেদিকে তাকালে
কর্মচারীদের আবাসস্থল দেখা যায়। এখন তার ভগ্নদশা। কিছু অংশ সংস্কার করে বাস-উপযোগী
করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বসবাস করেন। ভবনের একটা বড় অংশ ভেঙে গিয়েছে। সিঁড়ির মুখেই
দুটি দরজা। একটি দরজা খোলা শুরুতেই একটি পালকি। ঠাকুর বাড়ির পালকি। হয়তো বংশ
পরম্পরায় ব্যবহার হয়েছে। আরও আছে, পড়ার টেবিল, চিঠি লেখার ডেস্ক, আলনা, গোল টি-টেবিল। এরপর এঘর থেকে
সেঘর। সেগুলোতে রক্ষিত রয়েছে রবীন্দ নাথের ব্যবহত নানারকম আসবাব-তৈজষপত্র : বেতের
চেয়ার, বড় ড্রেসিং টেবিল, চিনা মাটির ছাকুনি, টেবিল বেসিন, আলনা, দেবতার আসন, বড় টেবিল, শ্বেত পাথরের গোল টেবিল, ইজি চেয়ার, পিয়ানো, কাঠের দোলনা চেয়ার, সোফা সেট, হাতলযুক্ত চেয়ার, স্ট্যান্ডে সংযুক্ত দুটি
ড্রয়ার, হাতলওয়ালা গদিযুক্ত চেয়ার, আলনা স্ট্যান্ড, ৫টি আলমারি, আলমারির ভেতরে কেতলি, সসপ্যান, ফ্রাইপ্যান, লন টেনিস খেলার র্যাকেট, কাটা চামচ, চিনা মাটির ফুলদানি, ডিস, টব, জগ, জমিদারি মনোগ্রাম ৭টি, বালতি, কেরোসিনের বাতি, ঘণ্টা ট্রে, বাতির চিমনি ইত্যাদি। আরও
রয়েছে দুটি খাট। এছাড়া আরও বহু কিছু একসময় এখানে ছিল। যেগুলো ঢাকায় জাদুঘরে
স্থানান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় জনগণ ওই জিনিসগুলো আবার ফিরে পেতে চায়।
রবীন্দ নাথ ঠাকুরের সৃষ্টি-সম্ভারের উল্লেখযোগ্য অংশ
শাহজাদপুরে বসে রচিত হয়েছে। বৈষ্ণব কবিতা, দুই পাখি, আকাশের চাঁদ, পুরষ্কার, হৃদয় যমুনা, ব্যর্থ যৌবন, প্রত্যাখ্যান, লজ্জা, চিত্রা, শীতে ও বসন্তে, নগর সঙ্গীতে, নদীমাত্রা, মৃত্যু মাধুরী, স্মৃতি, বিলয়, প্রথম চুম্বন, শেষ চুম্বন, যাত্রী, তৃণ, মানস লোক, কাব্য, প্রার্থনা, ইছামতি নদী, আশিষ গ্রহণ, বিদায়, নব বিরহ, লজ্জিতা, বিদায়, হতভাগ্যের গান, কাল্পনিক, যাচনা, সংকোচ মানস, প্রতিভা ইত্যাদি কবিতা এখানে
লিখিত। পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারা প্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি গলাপগুলো এখানে
লিখেছেন। ছিন্নপত্রের ৩৮টি পত্র, পঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জন নাটক
শাহজাদপুরে লেখা। শাহজাদপুরে চোখে দেখা বাস্তব চরিত্রগুলো তার সাহিত্যে স্থান করে
নিয়েছে। এর মধ্যে, গোপাল সাহার মেয়ে সমাপ্তি
গল্পের নায়িকা, হারান চক্রবর্তী ছুটি গল্পের
ফটিক, তার কাছারির বাবুর্চি
কলিমুদ্দি চিরকুমার সভার কলিমুদ্দি মিঞা, পোস্টমাস্টার মহেন্দ লাল
বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পোস্টমাস্টার গল্পের নায়ক। স্বাধীনতার পর থেকে ব্যপকভাবে সরবে জেগে উঠেছে
রবীন্দ তীর্থ শাহজাদপুর।
তথ্যসুত্রঃ টুরিস্টগাইড২৪.কম
বিঃদ্রঃ এই ব্লগ এর সব পোস্ট পেতে ফেসবুকে আমাদের সাথে জয়েন করুন। জয়েন করতেনিচের লিঙ্কে যানঃ


No comments:
Post a Comment