Friday, January 30, 2015

ঘুরে আসুন রবীন্দ কাছারি বাড়ি- সিরাজগঞ্জ থেকে।


রবীন্দ  কাছারি বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শাহজাদপুরের সঙ্গে রবীন্দনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তার মানস গঠনেও এ অঞ্চলের প্রভাব অনস্বীকার্য। ১৯৪০ সালে বাণী সম্মেলনীতে তিনি স্বহস্তে লিখে পাঠান সে কথা। তিনি বলেছেনশাহজাদপুর তার অন্তরে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেসে সাহিত্য সাধনার যোগস্নেহ সেবার যোগ। ১৯৩৯ তের টাকা দশ আনায় জমিদারি কিনে নেন। তার আগে এখানে ছিল নীলকরদের নীলকুঠি। অভ্যাসবসত এর নাম কুঠিবাড়িই রয়ে গেছে। হলুদ রঙের দোতলা ভবন। ভবনের দৈর্ঘ্য ২৬.৮৫ মিটারপ্রস্থ ১০.২০ মিটারউচ্চতা ৮.৭৪ মিটার। প্রতি তলায় সাতটি করে ঘর। উত্তর ও দক্ষিণে প্রশস্থ বারান্দা। কুঠি-ভবনের পাশেই কাছারি বাড়িমালখানা ও কর্মচারীদের বাসগৃহ। পুরোটাই রবীন্দ -কাছারি। বর্তমানে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম করা হয়েছে। অডিটোরিয়ামে স্থানীয় অনুষ্ঠান এবং জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ -জš§জয়ন্তির অনুষ্ঠান করা হয়। প্রায় দশ বিঘা জমির ওপর পুরো কাছারি বাড়ির অবস্থিতি। ১৮৯০ সালে লন্ডন থেকে ঘুরে আসার পর রবীন্দ নাথ ঠাকুরের ওপর জমিদারি তদারকির ভার ন্যস্ত হয়। সে সময় কোনও স্থলযান চলাচলের রাস্তা ছিল না। বোটে করে পদ্মা এবং সালে শাহজাদপুরের শ্রী হরিদাস বসাকের চিঠির জবাবে লিখেছিলেনসেই আমার দূরবর্তী শাহজাদপুর অনেকবার আমার মনকে টানে....। আবারশাহজাদপুরেই যেন ধরণীর সঙ্গে কবিগুরুর প্রণয় ঘটে। ২৩ জুন ১৮৯১ সালে ইন্দাণী দেবীকে লিখেছেনতীরে যেখানে নৌকো বাঁধা আছে সেইখান থেকে একরকম ঘাসের গন্ধ এবং থেকে থেকে পৃথিবীর একটা গরম ভাপ গায়ের উপরে এসে লাগতে থাকে মনে হয় এই জীবন্ত উত্তপ্ত ধরণী আমার খুব নিকটে থেকে নিঃশ্বাস ফেলছেবোধ করি আমারও নিঃশ্বাস তার গায়ে গিয়ে লাগছে। (২৩নং পত্রছিন্নপত্রাবলী)। 
১৮৯০ থেকে ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত রবীন্দ নাথ শাহজাদপুরে জমিদারি দেখাশোনা করেছেন। ১৮৪০ সালে রবীন্দ নাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারাকানাথ ঠাকুর রানী ভবানীর কাছ থেকে আরও কয়েকটি নদী দিয়ে ভাসতে ভাসতে শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ির ঘাটে এসে নামতেন তিনি। নদীতে পানি কম থাকলে সোনাই নদীতে বোট রেখে রাউতারা থেকে পালকি করে আসতেন। ফুলঝোর নদী থেকে শাখা বেরিয়ে কুঠিবাড়ির পূর্বদক্ষিণপশ্চিম তিনদিক বেষ্টন করে তিন মাইল দক্ষিণের হুড়া সাগরে মিশেছিল। এই শাখা নদীতেই বোট এসে কুঠিবাড়িতে ভিড়ত। এখন সেখানে পাকা রাস্তা। নদীর চিহ্নমাত্র নেই। আবারকুটিবাড়িতে আসার জন্য নদী পথও নেই। তবেঢোকার পথ মোটামুটি একই আছে। কবিগুরু বোট বা পালকি করে যে পথে আসতেনসেই পথেই এখন বাস বা রিকশা চলাচল করে। শাহজাদপুরে দিলরুবা বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকের রাস্তা চলে গেছে কুঠিবাড়ির দিকে। রাস্তার শেষ মাথায় উত্তর-দক্ষিণ দুদিকে দুটি রাস্তা গেছে। উত্তর দিকের রাস্তায় গেলেই রবীন্দ -কাছারি বাড়ি। কাছারি বাড়ির পেছন দিকের গেইট এইটি। বর্তমানে এটাকেই প্রধান গেইট করা হয়েছে। সে সময় এখানেই ছিল ছোট নদীটিযার ঘাটে কবির বোট এসে থামত। কাছারি বাড়ির গেটে দাঁড়ালেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বড় বাগান। নানা রঙের ফুল। রবীন্দ নাথ এখানে ট্যাংক তৈরি করিয়েছিলেন বারো মাস পদ্ম রাখার জন্য। ট্যাংকটির চারদিকে সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বাঁধান ছিল। এখন অবশ্য সেই কৃত্রিম হ্রদ-পদ্ম নেই। তবে বাগানের ফুল দেখে রবীন্দ নাথের প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। বাগানের পরই তার হলুদ রঙের দোতলা কুঠি। নিচের তলা জুড়ে রবীন্দ নাথের নিজের বিভিন্ন ছবিতার আঁকা ছবি এবং তার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির পাতার অংশ বাধাই করে দেয়ালে টানানো রয়েছে। কিছুদিন আগেও এখানে লাইব্রেরি ছিল। অডিটোরিয়াম হওয়ার পর লাইব্রেরিটি তারই একটি কক্ষে স্থানান্তরিত হয়েছে। উত্তরদিকের বারান্দার একেবারে পশ্চিমে সিঁড়িঘর। গোল-প্যাঁচানো সিঁড়িটি যেন সবাইকেই উপরে উঠতে আহ্বান করে। ওঠার সময় পশ্চিমে একটি জানালা। সেদিকে তাকালে কর্মচারীদের আবাসস্থল দেখা যায়। এখন তার ভগ্নদশা। কিছু অংশ সংস্কার করে বাস-উপযোগী করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বসবাস করেন। ভবনের একটা বড় অংশ ভেঙে গিয়েছে। সিঁড়ির মুখেই দুটি দরজা। একটি দরজা খোলা শুরুতেই একটি পালকি। ঠাকুর বাড়ির পালকি। হয়তো বংশ পরম্পরায় ব্যবহার হয়েছে। আরও আছেপড়ার টেবিলচিঠি লেখার ডেস্কআলনাগোল টি-টেবিল। এরপর এঘর থেকে সেঘর। সেগুলোতে রক্ষিত রয়েছে রবীন্দ নাথের ব্যবহত নানারকম আসবাব-তৈজষপত্র : বেতের চেয়ারবড় ড্রেসিং টেবিলচিনা মাটির ছাকুনিটেবিল বেসিনআলনাদেবতার আসনবড় টেবিলশ্বেত পাথরের গোল টেবিলইজি চেয়ারপিয়ানোকাঠের দোলনা চেয়ারসোফা সেটহাতলযুক্ত চেয়ারস্ট্যান্ডে সংযুক্ত দুটি ড্রয়ারহাতলওয়ালা গদিযুক্ত চেয়ারআলনা স্ট্যান্ড৫টি আলমারিআলমারির ভেতরে কেতলিসসপ্যানফ্রাইপ্যানলন টেনিস খেলার র‌্যাকেটকাটা চামচচিনা মাটির ফুলদানিডিসটবজগজমিদারি মনোগ্রাম ৭টিবালতিকেরোসিনের বাতিঘণ্টা ট্রেবাতির চিমনি ইত্যাদি। আরও রয়েছে দুটি খাট। এছাড়া আরও বহু কিছু একসময় এখানে ছিল। যেগুলো ঢাকায় জাদুঘরে স্থানান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় জনগণ ওই জিনিসগুলো আবার ফিরে পেতে চায়।
রবীন্দ নাথ ঠাকুরের সৃষ্টি-সম্ভারের উল্লেখযোগ্য অংশ শাহজাদপুরে বসে রচিত হয়েছে। বৈষ্ণব কবিতাদুই পাখিআকাশের চাঁদপুরষ্কার, হৃদয় যমুনাব্যর্থ যৌবনপ্রত্যাখ্যানলজ্জাচিত্রাশীতে ও বসন্তেনগর সঙ্গীতেনদীমাত্রামৃত্যু মাধুরীস্মৃতিবিলয়প্রথম চুম্বনশেষ চুম্বনযাত্রীতৃণমানস লোককাব্যপ্রার্থনাইছামতি নদীআশিষ গ্রহণবিদায়নব বিরহলজ্জিতাবিদায়হতভাগ্যের গানকাল্পনিকযাচনাসংকোচ মানসপ্রতিভা ইত্যাদি কবিতা এখানে লিখিত। পোস্টমাস্টাররামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতাব্যবধানতারা প্রসন্নের কীর্তিছুটিসমাপ্তিক্ষুধিত পাষাণঅতিথি গলাপগুলো এখানে লিখেছেন। ছিন্নপত্রের ৩৮টি পত্রপঞ্চভূতের অংশবিশেষ এবং বিসর্জন নাটক শাহজাদপুরে লেখা। শাহজাদপুরে চোখে দেখা বাস্তব চরিত্রগুলো তার সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যেগোপাল সাহার মেয়ে সমাপ্তি গল্পের নায়িকাহারান চক্রবর্তী ছুটি গল্পের ফটিকতার কাছারির বাবুর্চি কলিমুদ্দি চিরকুমার সভার কলিমুদ্দি মিঞাপোস্টমাস্টার মহেন্দ লাল বন্দ্যোপাধ্যায় পোস্টমাস্টার গল্পের নায়ক। স্বাধীনতার পর থেকে ব্যপকভাবে সরবে জেগে উঠেছে রবীন্দ তীর্থ শাহজাদপুর। 

তথ্যসুত্রঃ টুরিস্টগাইড২৪.কম 

বিঃদ্রঃ এই ব্লগ এর সব পোস্ট পেতে ফেসবুকে আমাদের সাথে জয়েন করুন। জয়েন করতেনিচের  লিঙ্কে যানঃ




No comments: